যত্রতত্র শিল্প প্রতিষ্ঠান করা যাবে না: প্রধানমন্ত্রী

pm.jpg

ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদার জোগান দিতে সরকার দেশের কৃষি জমি রক্ষা করতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যত্রতত্র শিল্প প্রতিষ্ঠান করা যাবে না।’ রবিবার (৩ ডিসেম্বর) নবম জাতীয় এসএমই পণ্য মেলা-২০২১ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সারা দেশে ১০০টি শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলেছি। জাতির পিতা যে বিসিক শিল্প নগরী গড়ে তুলেছিলেন, সেগুলোও সম্প্রসারণ করছি। তাই সুনির্দিষ্ট জায়গায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ ঠিক থাকে। পরিবেশের যেন কোনও ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

যত্রতত্র বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান না করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে এসএমই ফাউন্ডেশনকে নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা এ ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি দেবেন। কেউ যদি উদ্যোক্তা হয়—তাহলে কোথায় তার এই কাজগুলো করতে পারবেন, সেই নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে দেওয়া। নিজস্ব জমি কিংবা নিজের ঘরে করলে সেখানেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে করবে, কীভাবে করলে তা বাজারজাত করতে পারবে; সেটা ভালোভাবে দেখতে হবে।’

দেশের জনসংখ্যার ঘনত্বের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বড় শিল্পের সঙ্গে ক্ষুদ্র, মাঝারিসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে তোলার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে। আবার মানুষ যেন অল্প পুঁজি দিয়ে কিছু উৎপাদন করতে পারে, বাজারজাত করতে পারে, আর্থিকভাবে সচ্ছলতা লাভ করতে পারে; সেই অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি।

যেসব অঞ্চলে যে ধরনের পণ্য বা কাঁচামাল উৎপাদন হয়, সেসব অঞ্চলে সেই ভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সরকার কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে নজর দিচ্ছে বলে জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, আমরা মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সবজি থেকে সবকিছু উৎপাদন বাড়াতে পেরেছি। কাজেই উদ্বৃত্ত যে পণ্য রয়েছে তাকে প্রক্রিয়াজাত করে…। আমাদের দেশেও বাজার সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও মাথাপিছু আয় বেড়েছে। গ্রামের মানুষ যাতে সব নাগরিক সুবিধা পায়, সেই সুবিধাটা আমরা দিতে পারছি।

তিনি বলেন, দেশের ৯৯ দশমিক ৭৫ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। আমরা শতভাগ বিদ্যুৎ দেবো সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব শতবর্ষে, এটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য আমরা অর্জন করবো। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে দিয়েছি। এতে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কোনও সমস্যা থাকে না। সেই বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন, খাদ্যের বাজার চিরদিনই থাকবে। দেশের মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে। খাদ্য ও পুষ্টিজ্ঞান সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি আমরা খাদ্যপণ্য বিদেশে রফতানি করতে পারবো। পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোন দেশে কি চাহিদা আছে, সেই মোতাবেক আমাদের দেশের কোন পণ্য বা কাঁচামাল পাওয়া যেতে পারে; সেগুলো বিবেচনা করে আমরা সহজে শিল্প গড়ে তুলতে পারি। তাতে আমাদের দেশের বাজার সম্প্রসারণ হবে। বিদেশেও পণ্য রফতানি করতে পারবো।

করোনাভাইরাসের পরে খাদ্যের চাহিদা আরও বেড়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক উন্নত দেশ এখন খাদ্য সংকটে ভুগছে। আমাদের এখানে নেই। কারণ, করোনার শুরু থেকেই আমরা নির্দেশনা দিয়েছি খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য। সেই রকম ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাই আমরা এখনও ভালো অবস্থানে রয়েছি।

পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে মান ঠিক রাখার অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এই বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ অনেক বেশি প্রয়োজন। চাকরির পিছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য দেশের তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, নিজে কাজ করবেন, অন্যকে কাজের সুযোগ করে দেবেন।

এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উৎপাদিত পণ্যের প্রসার, প্রচার ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নারী উদ্যোক্তারা একসময় পিছিয়ে ছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের মাঝে খুব একটা উদ্যোক্তা ছিল না। এখন তারা এগিয়ে আসছে। নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে এসএমই ফাউন্ডেশন তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আশা করি সামনের দিকে আরও বেশি নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে।’

পুরুষদের পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারাও ব্যবসা করেন। স্ত্রীর নামে এই ফাউন্ডেশন থেকে ঋণ নিয়ে তাকেও একটু কাজ করার সুযোগ করে দেন, তাহলে সংসারের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়নও করতে পারবে। এতে উদ্যোক্তাও সৃষ্টি হবে, এই সুযোগে বাধা দিয়েন না।’

নারী উদ্যোক্তারা যেন বিশেষভাবে সুবিধা পায় সেদিকে খেয়াল রাখার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। বিসিক শিল্প নগরী ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সারাদেশে ৭৮ লাখ এসএমই শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন করে মানুষের কাজের সুযোগ হলে ৭৮ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এই খাতের উন্নয়নের জন্য আমরা সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাবো।

বদলে যাওয়া বাংলাদেশ হলো বাস্তবতা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৭-০৮ সালে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ১৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শুধু জিডিপি বৃদ্ধি না, অর্থনৈতিক অনেক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

সরকার এসএমই নীতিমালা প্রণয়ন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন এই খাতে জাতীয় আয়ে ২৪ শতাংশ অবদান রাখছে। আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশে উন্নতি করতে চায়।

তিনি বলেন, সারাদেশে যাতে শিল্পায়ন হয়, সেই ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য দেশটাকে উন্নত করতে হবে। দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের লক্ষ্য দারিদ্র বিমোচন, মানুষের আয় বৃদ্ধি করা। দারিদ্র্যের হার থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করা। পাশাপাশি নারী সমাজ যাতে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতা অর্জন করতে পারে। যেটা তার সংসার ও দেশের কাজে লাগবে। সেই অনুযায়ী অনেক উদ্যোগ নিয়েছি।

শেখ হাসিনা বলেন, ৯৬ সালে আমি ক্ষমতায় এসে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করি। কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করি। যাতে যুবকরা বিনা জমানতে ঋণ পায়। নিজেরা উদ্যোক্তা হতে পারে। সেই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্যও আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি।

দেশে অনেক বিদেশি উদ্যোক্তা এসএসই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের বন্দর, বিমানে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছি। এমনকি রেলওয়েকেও উন্নত করছি। সেখানেও পণ্য সরবরাহের সুযোগ থাকবে। বিদেশিরা এসএমই খাতে বিনিয়োগ করতে চান। এটা ভালো দিক। আমরা তাদের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি। সবাইকে করোনার স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে চলার আহ্বান করেন প্রধানমন্ত্রী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিশেষ অতিথি শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন জাতীয় এসএমই পুরস্কার ২০২১ বিজয়ী চার উদ্যোক্তার হাতে ক্রেস্ট, সনদ ও চেক তুলে দেন।

বিশেষ অতিথি এবং আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা, এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ড. মো. মাকসুদুর রহমান বক্তৃতা করেন। মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top