বাণিজ্য-রফতানি বাড়াবে পদ্মা সেতু

jjhgds.jpg

প্রতিদিন ডেস্ক:পদ্মা সেতু বদলে দেবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চালচিত্র। বাড়বে বাণিজ্য ও রফতানির সম্ভাবনা। তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান। সেতুর ওপর দিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের পাইপলাইন। সেতু ঘিরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। এতে সেতু এলাকার মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। এমন স্বপ্নই দেখছেন অবহেলিত এ জনপদের সাধারণ মানুষ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এসব তথ্য।

জানা গেছে, এক সময়ের অজপাড়া গাঁ ফরিদপুরের ভাঙ্গা এখন জংশন। ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে নদী পার হয়ে গাড়ির গতি গিয়ে থামবে এখন ভাঙ্গায়। কারণ এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম ধাপ গিয়ে শেষ হয়েছে ভাঙ্গায়।
সেখান থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তিন দিকে যাওয়া তিনটি সড়ক দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলাকে যুক্ত করেছে পদ্মা সেতুর সঙ্গে। ফলে শিল্পায়নের নজর এখন পুরো দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে হলেও শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও বরিশালকে কেন্দ্রবিন্দু মনে করছেন শিল্পপতিরা।
ইতোমধ্যেই সেতুকে ঘিরে আশপাশের জেলাগুলোতে শুরু হয়েছে শিল্পায়ন। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলা, বিশেষ করে মাদারীপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুরের মানুষের মধ্যে এখন পরিবর্তনের উন্মাদনা কাজ করছে। এসব এলাকায় জমির দাম যেমন বেড়েছে, তেমনই বাড়ছে স্থাপনা।

এখন সেখানে এক বিঘা জমির দাম স্থানভেদে পঞ্চাশ লাখ থেকে এক কোটি টাকায় গড়িয়েছে। অনেকে শিল্প-প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি কিনে রেখেছেন।

জানা গেছে, এখানে গড়ে উঠছে তাঁতপল্লী। প্রধানমন্ত্রীর নামে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা মৌজায় ৫৯ দশমিক ৭৩ একর ও মাদারীপুর জেলার শিবচরের কুতুবপুর মৌজায় ৬০ একর করে ১১৯ দশমিক ৭৩ একর জমিতে নির্মাণ হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় তাঁতশিল্প ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী’।

প্রকল্পের আওতায় ৮ হাজার ৬৪টি তাঁত শেড নির্মাণ করা হবে। যেখানে ৮ হাজার ৬৪ তাঁতীকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হবে। এই তাঁতপল্লীতে বার্ষিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৩১ কোটি মিটার কাপড়ের।

পদ্মা সেতু এলাকায় এ পল্লীর প্রথম পর্যায়ে মাটি ভরাট ও সীমানা প্রাচীরের কাজ শেষ হবে জুনের মধ্যেই। এ শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠিত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এক হাজার ৯১১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের নির্মাণকাজ করছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। শরীয়তপুর প্রান্তের রেলস্টেশনের কাছে হচ্ছে এ তাঁতপল্লী, যাতে তাঁতীরা কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদিত পণ্য সহজে আনা-নেওয়া করতে পারবেন।

এর বাইরেও মাদারীপুরের শিবচর, শরীয়তপুরের জাজিরা, নড়িয়া ফরিদপুরের ভাঙ্গাসহ বিভিন্ন উপজেলায় বড় বড় শিল্প গ্রুপ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য জমি কিনে রেখেছেন।

তৈরি হচ্ছে পার্ক-রিসোর্ট। এ ছাড়া নদীভাঙন ঠেকাতেও নড়িয়া, জাজিরা, শিবচরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নড়িয়ায় ভাঙন ঠেকাতে তৈরি হওয়া বেড়িবাঁধে পর্যটকরা নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন প্রতিদিন। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায় তৈরি হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল।

জানা গেছে, বেসরকারি উদ্যোগে ইলিয়াস আহম্মেদ চৌধুরীর নামে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় ‘দাদা ভাই উপশহর’ হাউজিং প্রকল্পের প্লট প্রস্তুতির কাজ ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু বহুতল ভবন হয়েছে এবং সেগুলোতে মানুষ থাকতে শুরু করেছে। প্রায় ১০৫ একর জমিতে গড়ে ওঠা এ প্রকল্পে ১ লাখের বেশি মানুষের আবাসন হবে।

এর বাইরে ওপারেই হচ্ছে শেখ হাসিনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব নার্সিং ইনস্টিটিউট অ্যান্ড কলেজ, আইএইচটি ভবন, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, শিল্পকলা একাডেমি ভবন, মুক্তমঞ্চ ও অলিম্পিক ভিলেজ।

সেতুর ওপারে হবে আইটি পার্ক। শিবচরে এটি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশে শিবচরের কুতুবপুরের কেশবপুরে ‘শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি অ্যান্ড হাইটেক পার্ক’ নির্মাণে ৭০ একর জায়গা নির্ধারণ করেছে আইসিটি মন্ত্রণালয়। প্রকল্প পাস হলেই ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হবে। সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তোলা হবে বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও আইকন টাওয়ার।

এ ছাড়া পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় সেতুর দুই প্রান্তে পদ্মা সেতু উত্তর থানা ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা নামে দুটি থানা স্থাপন করা হয়েছে। সেতুর জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার আওতায় থাকবে পূর্ব নাওডোবা ও পশ্চিম নাওডোবা নামে দুটি ইউনিয়ন।

অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতু উত্তর থানার আওতায় থাকবে মেদিনীমন্ডল ও কুমারভোগ নামে দুটি ইউনিয়ন।

পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার জন্য জাজিরা প্রান্তে তৈরি করা হয়েছে শেখ রাসেল সেনানিবাস। গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেনানিবাস উদ্বোধন করেন।

‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আলোকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে পায়রা সামুদ্রিক বন্দর নির্মাণ প্রকল্প শেষের দিকে। উৎপাদন শুরু করেছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই দুই প্রকল্প ঘিরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা নতুনভাবে অর্থনেতিক সমৃদ্ধি অর্জনকারী উপজেলা।

সেতুতে সংযুক্ত করা রেললাইন প্রকল্পটি শতভাগ বাস্তবায়িত হলে দেশের রেললাইন যাবে পায়রা বন্দর পর্যন্ত।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর প্রভাবে ওপারের জনপদ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডি অনুসারে এই সেতু জিডিপিতে ১ দশমিক ২ শতাংশ অবদান রাখবে বলে প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল। এখন তা দুই শতাংশ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top
error: Content is protected !!