বুয়েট থেকে কুয়েট:ছাত্র রাজনীতির বলি ২৯শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ শেষ!

Polish_20220106_013135869.jpg

সোহাগ দেওয়ান:
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)’র দুটি মৃত্যুও ঘটনায় ২৯জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার হ‌য়ে গেছে। বুয়েটে সহপাঠী আবরারকে হত্যার দায়ে গত ৮ ডিসেম্বর ২০জন শিক্ষার্থীকে ফাঁসি ও ৫জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। অরদিকে কুয়েটের অধ্যাপক ড. মোঃ সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীকে আজ ৫জানুয়ারি আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। এই দুটি মৃত্যুর পেছনেই রয়েছে ক্যাম্পাসের রাজনীতি।

বুয়েটের আবরার হত্যাকান্ডে আদালতে ফাঁসি, যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত ২৫জন শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের নেতাকর্মি ছিলেন। এছাড়া কুয়েটে আজীবন বহিষ্কার হওয়া ৪জনের মধ্যে ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রয়েছেন। বাকীরাও এ ছাত্র সংগঠণের অনুসারী বলে জানা গেছে। এছাড়া ১৭জন শিক্ষার্থী‌কে বি‌ভিন্ন মেয়া‌দের ব‌হিস্কার ক‌রে‌ছে কু‌য়েট প্রশাসন। মেধাবী এসকল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শেষ, পাশাপাশি তাদের বাবা-মায়ের আশা আকাঙ্খারও কবর রচিত হয়েছে। ক‌লেজ, বিশ্ব‌বিদ‌্যালয় গু‌লো‌তে রাজনী‌তি নি‌ষিদ্ধ করার দা‌বি কর‌ছেন অ‌ভিভাবকরা।

নাম প্রকা‌শে অ‌নিচ্ছুক বেশ ক‌য়েকজন অ‌ভিভাবক সরকারের কা‌ছে জোর দা‌বি জা‌নি‌য়ে ব‌লেন, অ‌নেক প‌রিশ্রম ক‌রে ছে‌লে মে‌য়ে‌কে তিল তিল ক‌রে গ‌ড়ে তু‌লে বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য় পর্যন্ত অান‌তে হয়। বিশ্ব‌বিদ‌্যালয় পড়ুয়া ওই সকল শিক্ষার্থী‌দের নি‌য়ে বাবা মা‌য়ে‌দের অ‌নেক স্বপ্ন লুকা‌নো থা‌কে। ছে‌লে মে‌য়ে‌কে ডাক্তার, ই‌ঞ্জি‌নিয়ার, ম‌্যা‌জি‌স্ট্রেট, ডি‌সি, এস‌পি করার স্বপ্ন দে‌খে সব অ‌ভিভাবক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠা‌নের ছাত্র রাজনী‌তির কার‌নে অ‌নে‌কের সেই স্বপ্ন ভে‌ঙ্গে চুরমার হ‌য়ে যায়। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠা‌নে ছাত্র রাজনী‌তি নি‌ষি‌দ্ধের দা‌বি জানান এসকল অ‌ভিভাবকরা।

এ‌বিষ‌য়ে সরকা‌রি বেসরকা‌রি বেশ ক‌য়েকজন শিক্ষ‌কের সা‌থে কথা বলা হয়। তা‌দের ম‌ধ্যে অ‌ধিকাংশ শিক্ষক ছাত্র রাজনী‌তি নি‌ষি‌দ্ধের প‌ক্ষে মতামত দেন। ত‌বে কেউ কেউ ‌বলেন, ‌শিক্ষা প্রতিষ্ঠা‌নে ছাত্র রাজনী‌তি চলমান থাকারও প্রয়োজন র‌য়ে‌ছে। ত‌বে এ‌ক্ষে‌ত্রে সরকা‌রের পক্ষ থে‌কে কিছু সুনি‌র্দিষ্ট নির্দেশনা, নী‌তিমালা জু‌ড়ে দি‌তে হ‌বে। শুধু তাই নয় সেসকল নির্দেশনা ও নী‌তিমালা অনুসর‌নের জন‌্য সং‌শ্লিষ্ট বিশ্ব‌বিদ‌্যালয় প্রশাসন‌কে শ‌ক্তিশালী হ‌তে হ‌বে। তাহ‌লেই‌ বুয়েট ও কু‌য়ে‌টে ঘ‌টে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃ‌ত্তি হ‌বে না।

প্রসঙ্গত: ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের মেধাবী ছাত্র অাবরার‌কে পি‌টি‌য়ে হত‌্যা ক‌রে ওই ক‌্যম্পা‌সের ছাত্রলীগ নেতাক‌র্মিরা। প্রতিপক্ষ রাজ‌নৈ‌তিক দ‌লের ছাক্র সংগঠ‌নের সদস‌্য স‌নে ক‌রে তা‌কে পি‌টি‌য়ে হত‌্যা করা হয়। শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে অাবরা‌রের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রাত দুইটা থেকে আড়াইটার দিকে হত্যার ঘটনা ঘটে। মরদেহ উদ্ধার করা হয় ভোরে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ পরদিন চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। এ হক‌্যাকা‌ন্ডের পু‌রো ভি‌ডিও ফুটেজ বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ের সি‌সি ক‌্যা‌মেরা গু‌লো ধারন হ‌য়ে থা‌কে। গণমাধ‌্যমে ব‌্যপকভা‌বে প্রচার হয় নে সকল ভি‌ডিও ফু‌টেজ। সারা‌দে‌শের মানু‌ষ বিচা‌রের দা‌বি‌তে ফু‌সে ও‌ঠে । আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বুয়েট কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির ২৬জন ছাত্রকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেন। সেখানে বুয়েট ছাত্রলীগের ১৯ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। কুষ্টিয়ার ছেলে আবরার ফাহাদ বুয়েটের ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়।
অব‌শেষে গত ৮ ডিসেম্বর ২০জন শিক্ষার্থীকে ফাঁসি ও ৫জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। ৩০২ ধারায় হত্যা, ৩০২ এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী হত্যার পূর্ব-পরিকল্পনা এবং ১০৯ ও১১৪ ধারায় হত্যায় অংশগ্রহণের অভিযোগ প্রমা‌নিত হওয়ায় এ দন্ডা‌দেশ দেয় অাদালত। মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামী কারাগারে রয়েছেন। তিনজন পলাতক র‌য়ে‌ছেন।

অপর‌দি‌কে গত ৩০ নভেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেনের অস্বাভা‌বিক মৃত্যু হয়।

অধ্যাপক সেলিমের মৃত্যুর পর অভিযোগ ওঠে, কুয়েটে শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ কয়েকজন ছাত্র তাদের মনোনীত প্রার্থীকে ডাইনিং ম্যানেজার করার জন্য হল প্রভোস্ট ড. সেলিম হোসেনকে নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাদমান নাহিয়ান সেজানের নেতৃত্বাধীন ছাত্ররা ক্যাম্পাসের রাস্তা থেকে ড. সেলিম হোসেনকে জেরা করা শুরু করেন।
পরবর্তী সময়ে তারা শিক্ষককে ধরে নিয়ে তার ব্যক্তিগত কক্ষে (তড়িৎ প্রকৌশল ভবন) প্রবেশ করেন। সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা আনুমানিক আধা ঘণ্টা ওই শিক্ষকের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এরপর শিক্ষক সেলিম দুপুরে খাবার খেতে ক্যাম্পাস সংলগ্ন বাসায় যান। বিকাল ৩টার দিকে স্ত্রী লক্ষ করেন তিনি বাথরুম থেকে বের হচ্ছেন না। পরে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে, মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনে দাফনের ১৫ দিন পর গত ১৫ ডিসেম্বর সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রাম কবরস্থান থেকে ড. সেলিমের লাশ উত্তোলন করা হয়। এরপর মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য লাশ ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৬ ডিসেম্বর রাতে লাশ কুষ্টিয়া পৌঁছানোর পর ওই একই কবরে দাফন করা হয়।
অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ চার শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আনিছুর রহমান ভুঁঞা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
লেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ৭৯তম সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top