মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বাজেট চাই

Press-Photo-CIDD-11-6-22.jpg

ঢাকা অফিসঃ ঢাকার একটি স্থানীয় ক্লাবে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ’সেন্টার ফর ইন্ক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ডায়ালগ (সিআইডিডি)’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ’প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ বাজেট’-এর উপর একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন জনাব এম.এ মান্নান, এম.পি, মাননীয় মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং ট্রাষ্টি জনাব সৈয়দ নুরুদ্দিন আহমেদ তাঁর স্বাগত বক্তব্যে সিআইডিডি’র আদর্শ ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেন, আমরা অন্তর্ভুক্তিমুলক উন্নয়ন চাই। সরকার, সংশ্ল্ষ্টি সংস্থা এবং জনগনকে সেই আদর্শে সচেতন ও উজ্জীবিত করা এবং পাশাপাশি পাবলিক পলিসিসমুহের অন্তরর্ভুক্তির জায়গাগুলোতে প্রয়োজনে পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও পরিবর্তনের জন্য সরকারকে প্রভাবিত করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে সংস্থাটি গবেষণা ও বাস্তব ভিত্তিক কর্মসূচী ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
সিআইডিডি’র মহাসচিব ও সাউথইষ্ট বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য, ড. এএফএম মফিজুল ইসলাম, ”মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বাজেট চাই” শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে। কারন হিসেবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন রাশিয়া ও ইউক্রেণ থেকে গম আমদানি করতে পারছে না। রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে সার আমদানি করতে পারছে না। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটছে। আমদানি কাঁচামালের দাম বেড়ে যাচ্ছে, জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। সামনে আসছে স্বাভবিকের চেয়ে বেশী মাত্রার বন্যা। বিশে^ দেখা দিচ্ছে মহামন্দা। এসব তথ্য একত্রিত করলে দাঁড়ায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তেড়ে আসতে পারে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি।

জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলি’র কথার রেফারেন্স টেনে তিনি বলেন, এ বছর খাদ্যের দাম বাড়লেও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু আগামী বছর বাজারে খাদ্যের অভাব দেখা দিতে পারে’। যে পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, তাতে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে দরিদ্র, কর্মহীন বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা, স্বামী পরিত্যক্তা, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী। তিনি প্রশ্ন রাখেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কে নিবে এদের দায়িত্ব! নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেখা যায়, রাষ্ট্র কখনও এদের দায়িত্ব নেয় নি। মূলত নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্র নাগরিকের কল্যাণে অধিকতর দায়িত্ব নিতে শুরু করে। তখনই বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার মতো কর্মসূচিগুলো চালু হয়। পরবর্তিকালের বাজেটগুলোতে এসব কর্মসূচির আওতা ও সুবিধার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সমাজের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নতুন নতুন কর্মসূচি যোগ হতে থাকে। এবারে অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন (প্রথম আলো, ৯ জুন), দরিদ্র মানুষ কষ্টে আছেন। তাদের কথা মাথায় রেখেই নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আগামি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১২২ টি বিষয় বা কর্মসূচীর কথা বলা হয়েছে, এবং মাত্র এক-দেড় বছরের ব্যবধানে ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাজেটে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির এহেন পদক্ষেপ কম কথা নয়।

সরকার অনেক ভালো ভালো কাজ করে যাচ্ছেন সন্দেহ নেই। এতদসত্বেও অসন্ন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ড. মফিজূল ইসলাম কতিপয় সুপারিশ রেখেছেন। বয়ষ্ক ব্যক্তি, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অক্ষম ও অসচ্ছল ব্যক্তির জনপ্রতি মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০০ টাকা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা ৭৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা করতে হবে। নইলে আসন্ন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কায় এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর ’খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর’ আওতায় যে সমস্ত গরিব পরিবারকে ১০ টাকা কেজি চালের দর ১০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ টাকা করার প্রস্তাব বাজেটে রয়েছে, তা আসছে বাজেটে না করাটাই ভালো। কেননা আশংকিত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা শুধু চাউলের উপর নয়, ডাল, তেল, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুনসহ সব নিত্যপণ্যই বাড়তি দামে কিনে খেতে হবে।

ড. মফিজুল ইসলাম আরও বলেন, আগামী ২০২২-২৩ বাজেটের সবচেয়ে বড় সুখবর হলো অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর বাজেটে নতুন করে যুক্ত হবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা। প্রবীণরা শেষ বয়সে তীব্র অর্থকষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করেন। রোগাক্রান্ত ভগ্ন শরীর নিয়ে ধুকে ধুকে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে হয় মারাত্মক অর্থ সংকটে। সর্বজনীন পেনশন স্কীমের মত এতো চমৎকার একটি ব্যবস্থা মাঝপথে এসে মুখ থুববে যাতে না পরে তার জন্যে ড. মফিজূল ইসলাম কতিপয় সুপারিশ রেখেছেন। তিনি বলেন, পেনশন স্কীম চালুর জন্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে, তার জন্য বাংলাদেশকে ”ধীরে চলো নীতিতে” অগ্রসর হতে হবে। লক্ষ্যার্জনে প্রথমত: ক্রমান্বয়ে রাজস্ব খাতকে শক্তিশালী করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত: সবশ্রেণীর মানুষের জন্যে স্কীমটি একসংগে চালু না করে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদে সবশ্রেণীর মানুষকে এই স্কীমের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এতে সময় লাগবে, কিন্তু টেকসই হবে। আমাদের ২০-বছর মেয়াদী প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) অনুযায়ী ২০৩০ সলে আমরা দারিদ্রমুক্ত হবো এবং ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত হবো। সেটাকে সামনে রেখে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নের এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে অনগ্রসর ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০৩০ সালের মধ্যেই সর্বকালীন পেনশন স্কীমের অনর্ভুক্ত করা যায় এবং ২০৪১ সালে যেদিন আমরা উন্নত দেশে পরিনত হবো সেদিন যেন একটি গোষ্ঠী বা একটি লোকও এই স্কীমের বাইরে না থাকে, পায় আজীবন আর্থিক নিরাপত্তা। সর্বকালীন পেনশন ব্যবস্থা টেকসই হউক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ড. মফিজুল ইসলাম বলেন, আর একটি মহান কাজে হাত দিতে পারে সরকার, তা হলো বেকার ভাতা। প্রথমদিকে বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর জন্য বেকার ভাতা স্কীম চালু করে ধীরে ধীরে সর্বশ্রেণীর বেকার মানুষের জন্য বেকার ভাতা স্কীম চালু করতে হবে। দরিদ্র ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে যেখানে মাসিক ভাতা ১০০০ টাকা সুপারিশ করেছি, বেকারদেরকেও সমপরিমান ভাতা দেয়া যেতে পারে।

পরিশেষে সমষ্টিক অর্থনীতির জনক জেএম কেইন্স এবং নোবেল বিজয়ী অভিজিত এর কথা স্মরণ করিয়ে ড. মফিজূল ইসলাম উল্লেখ করেন, কেইন্স এবং অভিজিত উভয়েই প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন – ’ দরিদ্র মানুষের হাতে টাকা দাও, সেটা কাজের বিনিময়ে হউক আর সরাসরি অর্থদান হউক। গরিব মানুষ তাদের সমুদয় অর্থ কেনাকাটায় ব্যয় করে। ফলে সমগ্রিক চাহিদার বৃদ্ধি ঘটে। সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধিই উŤপাদন বৃদ্ধি ঘটায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে সচল রাখে। কাজেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যেও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেটের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top
error: Content is protected !!