পদ্মা সেতু টোল চূড়ান্ত : আলো জ্বলবে চলতি মাসেই, জুনে উদ্বোধন

gfdd.jpg

প্রতিদিন ডেস্ক:পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে জুনেই। চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য উদ্বোধনের তারিখ হিসেবে ২৫ জুন আলোচনায় রয়েছে। বহুল প্রতীক্ষার এই সেতু উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। এর মধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজনে সেতু বিভাগ ১৮টি উপ-কমিটি গঠন করেছে। চলতি মে মাসের মধ্যেই সেতুতে আলো জ্বালানোর জন্য পল­ী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সেতু বিভাগ সূত্র বলছে, জুনের শেষ সপ্তাহে সেতু উদ্বোধনের বিষয়টি চূড়ান্ত। তবে উদ্বোধনের দিন হিসেবে কোন তারিখ বেছে নেওয়া হবে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জেনে নেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রীর মৌখিক সম্মতি পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের দিন-তারিখ ঠিক করে অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ পাঠানো হবে। সে অনুযায়ী উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র তৈরি, মঞ্চ প্রস্তুত এবং অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করা হবে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা ২৫ জুন সেতু উদ্বোধনের সম্ভাব্য তারিখ ধরে এগোচ্ছেন। দু-এক দিনের মধ্যেই বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাবে।

টোল নির্ধারণ : পদ্মা সেতু চলাচলের ক্ষেত্রে কী হারে টোল দিতে হবে তা নির্ধারণ করেছে সরকার। নদী পারাপারে যানবাহন ভেদে টোল ঠিক করা হয়েছে সর্বনিম্ন একশ’ টাকা থেকে ছয় হাজার টাকার বেশি।

রাষ্ট্রপতির আদেশে মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের উপ-সচিব আবুল হাসানের সই করা প্রজ্ঞাপনে এ কথা বলা হয়েছে। এর আগে গত ২৮ এপ্রিল পদ্মা সেতুর জন্য টোল হার প্রস্তাব করে অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠায় সেতু মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অনুমোদনের পর মঙ্গলবার তা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুসারে, সেতু বিভাগ থেকে যে টোল হার প্রস্তাব করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তা হুবহু অনুমোদন দিয়েছে।
সরকার নির্ধারিত টোল হার অনুযায়ী,

পদ্মা সেতু পারাপারে মোটরসাইকেলে ১০০ টাকা, কার ও জিপে ৭৫০ টাকা, পিকআপে এক হাজার ২০০ টাকা, মাইক্রোবাসে এক হাজার ৩০০ টাকা টোল পরিশোধ করতে হবে। বাসের ক্ষেত্রে ছোট বাস (৩১ আসন বা এর কম) এক হাজার ৪০০ টাকা, মাঝারি বাস (৩২ আসন বা এর বেশি) দুই হাজার টাকা এবং বড় বাস (৩ এক্সেল) দুই হাজার ৪০০ টাকা টোল দিতে হবে।
এছাড়া ছোট ট্রাককে (পাঁচ টন পর্যন্ত) এক হাজার ৬০০ টাকা, মাঝারি ট্রাকে (পাঁচ টনের বেশি ও সর্বোচ্চ আট টন পর্যন্ত) দুই হাজার ১০০ টাকা, মাঝারি ট্রাক (আট টনের বেশি ও সর্বোচ্চ ১১ টন) দুই হাজার ৮০০ টাকা, ট্রাকে (থ্রি-এক্সেল পর্যন্ত) পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা, ট্রেইলার (ফোর-এক্সেল পর্যন্ত) ছয় হাজার টাকা। আর ট্রেইলার (ফোর-এক্সেলের অধিক) ছয় হাজারের সঙ্গে প্রতি এক্সেলের জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা যুক্ত হবে। এ আদেশ পদ্মা বহুমুখী সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার দিন থেকে কার্যকর হবে।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আ’লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী পদ্মা সেতু উদ্বোধনের তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহŸান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, হঠাৎ কেউ কেউ পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের তারিখ বলে বেড়াচ্ছেন। এত অধৈর্য হবেন না। সারসংক্ষেপ যাচ্ছে। চূড়ান্ত তারিখ দেবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। আমরা সেতু বিভাগ থেকে সারসংক্ষেপ পাঠাচ্ছি, দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য। ইনশাআল­াহ আগামী জুন মাসে পদ্মা সেতু পুরোপুরি দৃশ্যমান হবে। জুনেই পদ্মাসেতু চালু করা হবে।
এ সময় তিনি পদ্মা সেতুর নামকরণ প্রসঙ্গে বলেন, শেখ হাসিনার নাম ছাড়া পদ্মা সেতু; এটা তাকে অসম্মান করা হবে। কিন্তু তিনি চান না। শেখ রেহানা চান না। তারা বলেন পদ্মা সেতু পদ্মা সেতু হিসেবেই থাকবে। এই পদ্মা সেতুর নাম সারা জাতি শেখ হাসিনার নামে নামকরণ করতে চায়। আমিও প্রস্তাব দিয়েছি। সারা বাংলাদেশ থেকে প্রস্তাব এসেছে। সর্বস্তরের মানুষ প্রস্তাব করেছে, পদ্মা সেতু হচ্ছে শেখ হাসিনার সাহসের সোনালি ফসল। এ কারণে পদ্মা সেতুর নাম শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু। এই দাবি আজও আমরা করছি।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের সড়ক পথে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের দুর্ভোগ লাঘবে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় আছে মানুষ। সেতুর নির্মাণ প্রায় শেষ। এখন উদ্বোধনীর অপেক্ষায়।
সরকারের নির্ধারণ করা টোলের হার অনুসারে, বর্তমানে ফেরিতে পদ্মা নদী পার হতে যে টাকা লাগে, সেতু পার হতে এর চেয়ে গড়ে দেড় গুণ বেশি টাকা খরচ করতে হবে। আর দ্বিতীয় দীর্ঘতম বঙ্গবন্ধু সেতুর টোলের সঙ্গে তুলনা করলে তা হবে প্রায় দ্বিগুণ।
সরকার আগামী মাসের শেষের দিকে পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচল উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এখন উদ্বোধন অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির কাজ চলছে।
সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের জন্য ম্যুরাল ও ফলক নির্মাণের কাজ চলছে। মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে ৪০ ফুট উচ্চতার দু’টি ম্যুরাল নির্মিত হচ্ছে। দু’টি ম্যুরালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি থাকবে। জুনে সেতুতে যান চলাচল উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে দিন-রাত কাজ চলছে বলে প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, সেতুতে এখন যেসব টুকিটাকি কাজ আছে, তা আগামী জুনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
পদ্মা সেতুর টোল আদায়কারী ও সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদার নিয়োগ করেছে সেতু বিভাগ। এ কাজ পেয়েছে কোরিয়া এক্সপ্রেস করপোরেশন (কেইসি) ও চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি)। এর মধ্যে এমবিইসি বর্তমানে মূল সেতুর নির্মাণ কাজ এবং কেইসি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই দু’টি প্রতিষ্ঠান টোল আদায়, সেতু ও সেতুর দুই প্রান্তে যানবাহন চলাচল ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি চালু এবং সেতু ও নদীশাসনের কাজ রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এর জন্য ৫ বছরে তাদের দিতে হবে ৬৯৩ কোটি টাকা।
পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলা সরাসরি সারা দেশের সঙ্গে যুক্ত হবে। আগেই ঢাকা-ভাঙ্গা পথে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ফলে এই পথে যাতায়াতের সময় কমে এক ঘণ্টায় নেমে আসবে বলে সওজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গত সোমবার পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি প্রকাশ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুসারে, সোমবার পর্যন্ত মূল সেতুর কাজ এগিয়েছে ৯৮ শতাংশ। নদী শাসনের কাজের অগ্রগতি ৯২ শতাংশ। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ।
পদ্মা সেতুর (মূল সেতু) দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দুই প্রান্তের উড়ালপথ (ভায়াডাক্ট) ৩ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। সেতু চালুর আগে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে ব্যয় বাড়বে কি না এবং বাড়লে কত বাড়তে পারে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
পদ্মা সেতুর (মূল সেতু) দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু দিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত সহজ হবে, সময়ও কমবে। চলাচল সহজ করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে পদ্মা সেতু। সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top
error: Content is protected !!