৫০ লাখ খরচ করে দুই কর্তার ডে-কেয়ার সেন্টার পরিদর্শনের প্রস্তাব

gjoi.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট :ঘাসচাষ ও খিচুড়ি রান্না প্রশিক্ষণের প্রস্তাবের পর এবার ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ দেখতে বিদেশ যাবেন দুই কর্মকর্তা। এক্সপোজার ভিজিট নামে এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

এতে একেকজনের পেছনে যাবে ২৫ লাখ টাকা করে। সেই সঙ্গে প্রকল্পটিতে পরামর্শক ব্যয়ও রাখা হয়েছে ৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে ৩০ জনমাস পরামর্শকের জন্য এ অর্থ ব্যয় হবে।

‘ইন্ট্রিগ্রেটেড কমিউনিটি বেজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম সেফ ফ্যাসিলিটিজ’ শীর্ষক একটি প্রকল্পে এমন প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ২৭১ কোটি ৮২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২১৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান থেকে ৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সোমবার বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ব্যাপক অপচয় করা হয়। কিন্তু আমরা যে কোনো অপচয়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম করছি।

এজন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা রয়েছে। ডে-কেয়ার সেন্টার প্রকল্পে বিদেশ সফরের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

প্রশিক্ষণের নামে অহেতুক বিদেশ সফরের কোনো কারণ নেই। এটা অবশ্যই অপচয়। আমি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যদের আরও কঠোর হতে নির্দেশনা দিয়েছি।

এর আগে স্কুল মিল প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের দুপুরে খাওয়ার জন্য খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এজন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল পাঁচ কোটি টাকা।

এছাড়া প্রাণীপুষ্টি উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্পে ঘাস চাষ শিখতে বিদেশ সফরের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল তিন কোটি ২০ লাখ টাকা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ দুই প্রস্তাবের সমালোচনা করে প্রতিবেদন ছাপা হয়। এরপর প্রস্তাব দুটি বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশে ডে-কেয়ার সেন্টার দেখার প্রস্তাব পাওয়ার পর গত বছরের ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা।

ওই সভায় দেওয়া সুপারিশগুলো প্রতিপালন করা হয়। ফলে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) আগামী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে এটির বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কার্যক্রম অনুবিভাগ) ডা. আরএ মো. মহিউদ্দিন ওসমানী  বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছি না। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, মাত্র দুজন কর্মকর্তা বিদেশ সফর করবেন।

এর যে ব্যয়, তা মোট প্রকল্প ব্যয়ের সামান্য, মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশের মতো। এটাকে বড় করে দেখার কিছু নেই। বেশি ব্যয় ধরা হলে আমি অবশ্যই আপত্তি দিতাম। অনেক সময় কর্মকর্তাদের প্রণোদনা ও রিফ্রেশমেন্টেরও প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে সামান্য বরাদ্দ রাখাটা দোষের কিছু নয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদেশে সফর নিয়ে কিছু বলা না হলেও পরামর্শক ব্যয় প্রসঙ্গে এর আগে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় সুপারিশ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, পারামর্শক সেবা গ্রহণ খাতে ব্যয় প্রাক্কলন যৌক্তিকভাবে কমিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।

সেই সঙ্গে পরামর্শকদের টিওআর যথাযথভাবে প্রস্তুত করে ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) যুক্ত করতে হবে। এর জবাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, পরামর্শক খাতে ৪ কোটি ৯২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা প্রস্তাব ছিল। সেখান থেকে কমিয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাবে ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কমানো হয়েছে মাত্র ১৫ লাখ টাকা।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশ সফরের নামে এ রকম ব্যয় অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। এটা হাস্যকর প্রস্তাব। এছাড়া ডে-কেয়ার সেন্টার ও সাঁতার শেখার জন্য কেন এত টাকার পরামর্শক প্রয়োজন হবে, সেটিও প্রশ্ন সাপেক্ষ।

যেসব কাজ (গ্রামে সাঁতার) শিশুরা নিজে নিজেই শিখতে পারে, সেসব কাজের জন্য আবার প্রকল্পেরই বা প্রয়োজন কী? সরকারি টাকা এক টাকা হলেও সেটির কার্যকর ব্যবহার দরকার।

প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, শিশুর সুষ্ঠু শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশে জীবনের প্রথম আট বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মৌলিক চাহিদা, বিশেষ করে খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা এবং শিক্ষার চাহিদা পূরণ করা শিশুদের বেঁচে থাকা ও জীবনকে পরিপূর্ণ সম্ভাবনাময় করার জন্য অত্যাবশ্যক।

বাংলাদেশ পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, প্রসবকালীন মৃত্যুহার হ্রাস এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে।

কিন্তু অপর্যাপ্ত সমন্বিত প্রারম্ভিক শিশু-যত্নের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশের অনেক শিশুই গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এই বয়সি শিশুমৃত্যুর বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পানিতে ডুবে মৃত্যু।

প্রকল্প প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা সমীক্ষায় বিশেষ বিষয় হিসাবে দেখানো হয়েছে যে, প্রতিবছর প্রায় ১৯ হাজার ২৪৭ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়।

যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই হলো শিশু। এই সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৫ বছরের কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে আছে।

এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে সাধারণত বাড়ির ২০ মিটারের মধ্যে অবাঞ্ছিত জলাধারে এবং দিনের প্রথম ভাগে। গ্রামাঞ্চলে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার এই হার শহরের চেয়ে বেশি। যার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে সেখানে পুকুর আর ডোবার মতো ছোট ছোট জলাধারের সংখ্যা বেশি।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, পানিতে ডুবে মৃত্যু শতকরা ৮৮ ভাগ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে তিনটি কৌশল সবচেয়ে কার্যকর। যেমন ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী শিশু যত্নের সুযোগ সৃষ্টি করা।

পানিতে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে ৬-১০ বছরের শিশুদের সাঁতার শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তা হ্রাস করার পদ্ধতি সম্পর্কে জনসাধারণ, মা-বাবা ও অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৩টি প্রতিরোধ কৌশলই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প মেয়াদে ১৬টি জেলার ৪৫টি উপজেলার ৩টি লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এগুলো হলো-৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য ৮ হাজার কমিউনিটিভিত্তিক সমন্বিত শিশু-যত্নকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা করা। এছাড়া ৬ থেকে ১০ বছরের শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ১ হাজার ৬০০ জন প্রশিক্ষককে সাঁতার প্রশিক্ষণ সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্যারেন্টিং সেশন পরিচালনা করা হবে। ফলে সেখানে শিশুর যত্ন, বিকাশ ও শিশু সুরক্ষার সর্বোত্তম চর্চার বিষয়ে তথ্য দেওয়া এবং সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top