অবগত নয়: তবুও পরিচিতদের মিথ্যা মামলায় স্বাক্ষী বানাতেন খুলনার প্রতারক মনি!

gail-moni-pic-f.jpg

আদালত প্রতিবেদক:মামলার বিবরণের ঘটনার বিষয়ে অবগত নয়, তবুও পরিচিত অনেককে নিজের ইচ্ছে মতো মিথ্যা মামলায় স্বাক্ষী করেন খুলনার বহুল আলোচিত প্রতারক ফরিদা ইয়াসমিন মনি (৪৩)। বিভিন্ন মানুষের নামে ঢাকা ও খুলনা মিলিয়ে প্রায় ৮/১০টি মামলায় তার স্বাক্ষীর সংখ্যা প্রায় এক ডজন। এদের মধ্যে তার নিকট আত্মীয়সহ রয়েছে পরিচিতজন। সম্প্রতি প্রতারক মনি গ্রেফতারের পর মিথ্যাভাবে সাজানো মামলার ওই সকল স্বাক্ষীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ থানায় জিডি করেছন আবার কেউ নিজ্ব নিজ্ব আইনজীবীর মারফত নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এ্যাভিডেভিট করে সত্যতা সামনে নিয়ে আসছেন। প্রতারক ফরিদা ইয়াসমিন মনি খুলনার সোনাডাঙ্গা থানাধিন করিম নগর মসজিদ এলাকার মৃত আব্দুল ওহাব খাঁনের মেয়ে। সে বসুপাড়া কবরখানা এলাকার টাওয়ার ওয়ালা গলির শহিদুল ইসলামের বাড়ির ৫তলার ভাড়াটিয়া। ২৪ নভেম্বর রাতে ওই বাড়ি থেকে প্রতারক চক্রের হোতা ফরিদা ইয়াসমিন মনিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৬ সদস্যরা। ২৫নভেম্বর সদর থানা পুলিশ আদালতে সোপর্দ করলে খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মনিকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। সর্বশেষ গত ২০ডিসেম্বর খুলনার মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোঃ শহিদুল ইসলাম আসামি মনি’র জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন।

এছাড়াও বহুল আলোচিত প্রতারক ফরিদা ইয়াসমিন মনি খুলনার দেবেনবাবু রোড এলাকা, ঢাকার রমনা থানাধিন মধুবাগ গলির বাড়ী নং ৪৫৯ (স্টার লজ), ঢাকার মুগদা থানার সবুজবাগ দক্ষিণ মান্ডা, চাঁন মিয়া গলির কাওসার আহম্মেদের ভাড়া বাসাসহ আরও একাধিক ঠিকানা ব্যবহার করেন।

বিভিন্ন অভিযোগ ও তথ্য সুত্রে দেখা যায়, কু-প্রস্তাব, ভয়ভীতি হুমকি, শারীরিক নির্যাতন, খারাপ নজরে তাকানো আর কখনও টাকা ধার দেয়ার অভিযোগের বাদি হন খুলনার প্রতারক ফরিদা ইয়াসমিন মনি (৪৩)। এসকল অভিযোগ তিনি পরিচিত নানা শ্রেণী পেশার মানুষের নামে করেই ব্লাকমেইল করতেন বলে বেশ কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রতারক ফরিদা ইয়াসমিন মনি খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি জিডি করে (নং-১৫২৫)। ওই জিডিতে তিনি দু’জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানীর চেষ্টা, কুপ্রস্তাব ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ দেন। পরে ওই জিডি’র অভিযোগ দেখিয়ে সেই ব্যক্তিদের ব্লাক মেইল করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া তার কথিত ২য় স্বামী নিউটন গাইন ওরফে লিটনসহ তার পরিবারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা অপহরনে মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট প্রদানকারী তদন্ত কর্মকর্তা একজন সাবেক সিআইডি’র পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধেও তিনি লিখিতভাবে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগে প্রতারক মনি ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কু-প্রস্তাবসহ নানা অভিযোগ তোলেন। পরে মোটা অংকের টাকা দাবি করে অভিযোগ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন। ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর কথিত ২য় স্বামী নিউটন গাইন প্রতারক মনি’র উশৃঙ্খল জীবন যাপন ও প্রতারনা বিষয়ে খুলনার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগে বলা হয়, নিউটন গাইনকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে ৮/৯টি মিথ্যা মামলা দেয় প্রতারক মনি। বর্তমানে সংখ্যালঘু ওই পরিবারটি খুলনার দাকোপের ভিটামাটি ছেড়ে কোলকাতায় পালিয়ে গেছেন। এছাড়া তার প্রথম স্বামী খুলনা নগরীর ময়লাপোতা মোড় এলাকার হায়দার আলী শেখ। প্রথম স্বামী শেখ হায়দার আলীও গত ১৩ জুন মনি’র বিরুদ্ধে সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি জিডি করেছেন (নং-৮৪০)। তাকে তার সাবেক স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন মনি ভয়ভীতি ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া দু’জন আইনজীবীর নামের সীল ও স্বাক্ষর জাল করে স্ট্যাম্প জাল জালিয়াতির অভিযোগে প্রতারক মনি’র বিরুদ্ধে খুলনা সদর থানায় পৃথক দুটি জিডি হয়েছে (যার নং-১৫০৬ ও ১৫০৭)। জিডি দায়ের করা ওই দু’জন আইনজীবী হলেন, নোটারী পাবলিক ও এপিপি মোঃ আব্দুল মান্নান এবং এড. মোঃ আতাহার হোসেন জোয়ারদার।

প্রতারক ফরিদা ইয়াসমিন মনি গ্রেফতার হওয়া মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, তিনশত টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে খুলনার সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ানের নামে একটি অঙ্গিকার নামা তৈরি করে এ প্রতারক মনি চক্র। ওই অঙ্গিকারনামায় বলা হয়, ফরিদা ইয়াসমিন মনি নামের এক নারীর সন্তান উদ্ধারের কথা বলে সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ান ৩লাখ ৭৭হাজার টাকা নিয়েছেন। এ অঙ্গিকারনামাটি ব্যবহার করে ওই চক্রটি সোহাগ দেওয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলাসহ নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে। এরপর প্রাথমিকভাবে প্রমান মেলে তিনশত টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তৈরি করা অঙ্গিকারনামাটি ২০১৮ সালের ৪জানুয়ারির তারিখে দেখানো হলেও সেটি আসলে ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর সরকারের সংশ্লি¬¬ষ্ট দপ্তর থেকে বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের নির্ধারিত দপ্তরে উক্ত স্ট্যাম্প তৈরির আড়াই বছর আগের তারিখ ব্যবহার করে আসামিরা সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ানকে ফাঁসানোর জন্য এই জাল জালিয়াতি করেছেন। সহকারি নিয়ন্ত্রক (স্ট্যাম্প) প্রধান কার্যালয় ও পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের ট্রেজারী শাখার লিখিত তথ্যমতে এ প্রাথমিক সত্যতা বেড়িয়ে আসে। এঘটনায় গত ১৫ নভেম্বর খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ওই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করতে কেএমপি’র সদর থানাকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ হাতে পেয়ে খুলনা সদর থানায় প্রতারক চক্রের প্রধান ফরিদা ইয়াসমিন মনিসহ ৫জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৩/৪জনের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করা হয়। দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৩৮৫, ১০৯ ও ৫০৬ ধারায় গত ১৯ নভেম্বর মামলাটি রেকর্ড করে পুলিশ (নং-৩৪)।

প্রতারক মনি’র ঢাকা, খুলনা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে ব্যক্তিগত কিছু মানুষ। তারা মনি’র বেআইনী কার্যক্রমের সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেন। মনি’র বিভিন্ন মামলা, জিডি, অভিযোগ ও সিআইডি সদর দপ্তরের তদন্তের আদেশ কপি’র মাধ্যমে চক্রের বেশ কিছু নাম পাওয়া গেছে। এরা মনি’র বিভিন্ন মামলার স্বাক্ষী সেজে থাকেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এরা হলেন, খুলনার দেবেনবাবু রোডের মোঃ সাঈদের স্ত্রী জোসনা, মোঃ নাসিমের স্ত্রী নাগিনা বেগম পুতুল, হামিদ শিকদারের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন, ঢাকার সিদ্দিক বাজার জাভেদ গলির দেলোয়ার হোসেন দিলুর ছেলে আশিকুর রহমান, তার স্ত্রী মিনা, মুগদা থানাধিন মান্ডা এলাকার লাল মিয়া গলির মৃত শাহাদাৎ হোসেনের ছেলে কাওছার আহমেদ চৌধুরী। এছাড়াও এ চক্রের সাথে আরও ১০/১২জন জড়িত বলে সুত্রে জানা গেছে।

তবে এদের মধ্যে মোঃ সাঈদের স্ত্রী জোসনা বেগম জানান, ফরিদা ইয়াসমিন মনিকে চিনি, কিন্তু তিনি অহেতুকভাবে মিথ্যা মামলায় আমাকে স্বাক্ষী করেছেন। আমি এসকল বিষয়ে কিছুই জানতাম না।

ঢাকার মুগদা থানার ২০২০ সালে ৪১ নম্বর একটি নারী শিশু মামলার স্বাক্ষী খুলনার দেবেনবাবু রোডের নাগিনা বেগম পুতুল। তার স্বামী মোঃ নাসিম বলেন, আমার স্ত্রী কোন কিছু জানেই না, কিন্তু তাকে ঢাকার একটি মামলায় স্বাক্ষী করেছেন ফরিদা ইয়াসমিন মনি।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top
error: Content is protected !!